আর্কিটেকচারাল ড্রয়িং-এ যখন আমরা ইটের দেয়াল বা ব্রিকওয়ার্ক দেখাই, তখন শুধু ইটের আকার-আকৃতি দেখালেই কাজ শেষ হয় না। বাস্তব নির্মাণে ইটের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় মর্টার (সিমেন্ট-বালি-পানির মিশ্রণ) ব্যবহার করা হয় এবং এই মর্টারের বাইরের দিকের ফিনিশিং বা সাজসজ্জাকে বলা হয় পয়েন্টিং। পয়েন্টিং শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, বরং মর্টারকে আর্দ্রতা থেকে রক্ষা করে, দেয়ালের স্থায়িত্ব বাড়ায় এবং ইটের সাথে মর্টারের মধ্যে সুন্দর সংযোগ তৈরি করে। বিভিন্ন ধরনের পয়েন্টিং-এর মাধ্যমে একই ইটের দেয়ালকে ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য ও শৈলী দেওয়া যায়।
এই পাঠটি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি (ভোকেশনাল) পর্যায়ের “আর্কিটেকচার ড্রাফট উইথ ক্যাড ১” বিষয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে আমরা বিভিন্ন প্রকার পয়েন্টিং-এর নাম, বৈশিষ্ট্য, ব্যবহার এবং অঙ্কন পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে জানব। পয়েন্টিং অঙ্কন শিখলে আর্কিটেকচারাল প্ল্যান, সেকশন ও এলিভেশন ড্রয়িং-এ দেয়ালকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও পেশাদারভাবে উপস্থাপন করা যায়।
এই পাঠটি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের, এসএসসি পর্যায়ের, ভোকেশনাল ডিসিপ্লিনের “আর্কিটেকচার ড্রাফট উইথ ক্যাড ১” বিষয়ের একটি পাঠ।

বিভিন্ন প্রকার পয়েন্টিং (Pointing) অঙ্কন

পয়েন্টিং-এর প্রধান প্রকারভেদ
বাস্তব নির্মাণ ও আর্কিটেকচারাল ড্রয়িং-এ সাধারণত যেসব পয়েন্টিং বেশি ব্যবহৃত হয়, সেগুলো হলো:
- স্ট্রাকচারাল পয়েন্টিং বা ফ্লাশ পয়েন্টিং (Flush Pointing) এটি সবচেয়ে সাধারণ ও সহজ পয়েন্টিং। এখানে মর্টার ইটের সমান্তরালে সম্পূর্ণ সমতল করে দেওয়া হয়। দেয়ালের পৃষ্ঠ একদম মসৃণ থাকে। অঙ্কনে এটি দেখাতে খুব সহজ—ইটের মধ্যবর্তী জয়েন্টগুলো শুধু পাতলা কালো লাইন দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
- রেকড পয়েন্টিং বা গ্রুভ পয়েন্টিং (Recessed / Raked Pointing) এখানে মর্টার ইটের সমতল থেকে ৩-৫ মিমি ভিতরে ঢোকানো হয়। ফলে ইটের প্রান্তগুলো স্পষ্টভাবে উঁচু দেখায়। এই পয়েন্টিং দেয়ালকে ছায়া-আলোর খেলা দেয় এবং খুব আধুনিক লুক তৈরি করে। অঙ্কনে ইটের মধ্যবর্তী জয়েন্টে একটি ছোট্ট গভীরতা দেখানো হয়।
- উইদারড পয়েন্টিং (Weathered Pointing) এই পয়েন্টিং-এ উপরের জয়েন্টগুলো সামান্য ঢালু করে দেওয়া হয় যাতে বৃষ্টির পানি সহজে গড়িয়ে পড়ে। এটি বাইরের দেয়ালে বেশি ব্যবহৃত হয়। অঙ্কনে উপরের হরাইজন্টাল জয়েন্টে একটি ছোট ঢাল দেখানো হয়।
- ভি-জয়েন্ট পয়েন্টিং বা ভি-শেপড পয়েন্টিং (V-Joint Pointing) মর্টারকে ভি আকৃতিতে কেটে দেওয়া হয়। এতে দেয়ালে একটি সুন্দর গভীরতা ও টেক্সচার আসে। অঙ্কনে প্রতিটি জয়েন্টে একটি ছোট V চিহ্ন আঁকতে হয়।
- স্ট্রাকড পয়েন্টিং বা রুলড পয়েন্টিং (Struck / Ruled Pointing) এটি উইদারডের মতোই, কিন্তু ঢালু দিকটা নিচের দিকে হয়। বৃষ্টির পানি দেয়াল থেকে দূরে সরে যায়।
- টাক পয়েন্টিং (Tuck Pointing) এটি অত্যন্ত পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী পয়েন্টিং। প্রথমে মর্টার দিয়ে ফ্লাশ করা হয়, তারপর খুব পাতলা সাদা লাইম মর্টার দিয়ে জয়েন্টের মাঝে একটি সরু লাইন তৈরি করা হয়। এতে দেয়াল খুব পরিষ্কার ও সুন্দর দেখায়। অঙ্কনে এটি দেখাতে খুব সরু সাদা লাইন দিয়ে জয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়।
- বি-ডেড পয়েন্টিং বা বি-জয়েন্ট পয়েন্টিং (Beaded Pointing) মর্টারকে বৃত্তাকার বা অর্ধবৃত্তাকার করে বের করে দেওয়া হয়। এতে দেয়ালে একটি সুন্দর গোলাকার টেক্সচার আসে।
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন
অঙ্কনের প্রস্তুতি ও পদ্ধতি
পয়েন্টিং অঙ্কনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম:
- HB বা 2H পেন্সিল
- ইরেজার
- স্কেল (৩০ সেমি ও ১৫ সেমি)
- সেট স্কোয়ার (৪৫° ও ৩০°-৬০°)
- প্যারালাল বার বা টি-স্কোয়ার
- ফ্রেঞ্চ কার্ভ (যদি প্রয়োজন হয়)
- স্কচ টেপ (ড্রয়িং শীট ঠিক রাখার জন্য)
প্রথমে ইটের দেয়ালের সাধারণ লেআউট আঁকুন (সাধারণত স্ট্রেচার বন্ড বা ইংলিশ বন্ড)। ইটের মাত্রা সাধারণত ৯.৫” × ৪.৫” × ২.৭৫” ধরে নেওয়া হয়। ইটের মধ্যবর্তী জয়েন্টের প্রস্থ সাধারণত ১০ মিমি।
প্রতিটি পয়েন্টিং-এর জন্য:
- জয়েন্ট লাইনগুলো খুব হালকা করে আঁকুন।
- পছন্দমতো পয়েন্টিং স্টাইল অনুযায়ী জয়েন্টের ভিতরে ছোট ছোট লাইন, ঢাল, V বা গোলাকার আকার আঁকুন।
- শেষে খুব হালকা হ্যাচিং (৪৫° কোণে পাতলা লাইন) দিয়ে ইটের দেয়াল ও মর্টারের পার্থক্য দেখান।
- মর্টারের অংশ সাধারণত হালকা শেড দিয়ে এবং ইটের অংশ খোলা রেখে বা হালকা টেক্সচার দিয়ে দেখানো হয়।

পয়েন্টিং অঙ্কন শিখে নিলে আপনি আর্কিটেকচারাল সেকশন, এলিভেশন এবং ডিটেইল ড্রয়িং-এ দেয়ালকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও পেশাদারভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন। এটি শুধু একটি টেকনিক নয়—এটি আর্কিটেকচারাল ড্রাফটিং-এর একটি শিল্প, যা আপনার ড্রয়িং-কে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তোলে।

